সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

আজ বিশ্ব স্ট্রোক দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য "স্ট্রোক প্রতিরোধে আপনার করণীয়"। স্ট্রোকের কারণ, লক্ষণ, চিকিৎসা ও প্রতিরোধ.....

আজ বিশ্ব স্ট্রোক দিবস।

"স্ট্রোকের কারণ, চিকিৎসা ও প্রতিরোধ" সম্পর্কে.......

আজ পালিত হচ্ছে বিশ্ব স্ট্রোক দিবস।
প্রতিবছর ২৯ অক্টোবর বিশ্বজুড়ে পালিত হয় এ দিবসটি।
এবারের প্রতিপাদ্য "স্ট্রোক প্রতিরোধে আপনার করণীয়"।

আমাদের দেশে প্রচলিত ধারণা হলো- স্ট্রোক একটি হৃৎপি-ের রোগ। বাস্তবে তা কিন্তু নয়। স্ট্রোক আসলে মস্তিষ্কের রোগ। মস্তিষ্কের রক্তবাহী নালির দুর্ঘটনাই স্ট্রোক নামে পরিচিত। এ দুর্ঘটনায় রক্তনালি বন্ধ হতে পারে। আবার ফেটেও যেতে পারে। ফলে মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়। স্ট্রোক সম্পূর্ণই মস্তিষ্কের রক্তনালির জটিলতাজনিত একটি রোগ। এ রোগে আক্রান্তের হার দিন দিন বেড়েই চলেছে। অনেক ক্ষেত্রে সচেতনতার অভাবেই এ রোগে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। আমাদের দেশে এখন ১৫ থেকে ২০ লাখ স্ট্রোকের রোগী রয়েছে। প্রতিহাজারে গড়ে ৩ থেকে ৫ জন স্ট্রোকে আক্রান্ত হচ্ছেন। সাধারণত পঞ্চাশোর্ধ ব্যক্তিদের মধ্যে স্ট্রোকে আক্রান্তের হার বেশি লক্ষ করা গেলেও যে কোনো বয়সেই তা হতে পারে। ৫০ বছর বয়সের পর প্রতি ১০ বছরে স্ট্রোকের ঝুঁকি দ্বিগুণ হয়। আক্রান্তদের মধ্যে পুরুষের সংখ্যাই বেশি। নারীদের মধ্যে স্ট্রোকে আক্রান্তের হার কম। ফাস্টফুডে আসক্তদের মধ্যে স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বেশি। শিশু ও তরুণদের অনেকে খাদ্যাভ্যাসের কারণে স্ট্রোক ঝুঁকির মুখে পড়তে পারেন।

স্ট্রোক হওয়ার কারণ:
অনেক কারণেই স্ট্রোক হয়। যেমনÑ অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ স্ট্রোকের সবচেয়ে বড় কারণ। ধূমপান, তামাক পাতা, জর্দা, মাদক সেবন, অতিরিক্ত টেনশন, হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, রক্তে বেশিমাত্রায় চর্বি, অলস জীবনযাপন, স্থূলতা বা অতিরিক্ত মোটা হওয়া, অতিরিক্ত মাত্রায় কোমল পানীয় গ্রহণ, কিছু কিছু ওষুধ, যা রক্ত জমাট বাঁধার ক্ষমতা কমিয়ে দেয়, যেমন- অ্যাসপিরিন, ক্লপিডগ্রেল ইত্যাদি ব্যবহারে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হতে পারে। ঘুমের সময় নাক ডাকা, ঘুমের সময় শ্বাসকষ্টজনিত উপসর্গ ছাড়াও স্ট্রোক করার কারণগুলোর মধ্যে আরও রয়েছে যে কোনো ধরনের প্রদাহ অথবা ইনফেকশন ও জন্মগতভাবে ব্রেইন বা মস্তিষ্কে সরু রক্তনালি থাকা। অনেক সময় বংশানুক্রমে কিংবা আগের স্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাক ও দূরবর্তী রক্তনালি বন্ধ হওয়ার কারণে স্ট্রোক হতে পারে।

লক্ষণ:
শরীরের কোথাও বা একাংশ অবশ ভাব লাগা কিংবা দুর্বলবোধ করা। কথা বলার সমস্যা অর্থাৎ কিছুক্ষণের জন্য কথা জড়িয়ে যাওয়া, অস্পষ্ট হওয়া ও একেবারে কথা বলতে বা বুঝতে না পারা।

এক চোখ বা দুচোখেই ক্ষণস্থায়ী ঝাপসা দেখা বা একেবারেই না দেখা। মাথা ঝিমঝিম করা, মাথা ঘোরা, দৃষ্টি ঘোলা লাগা, হঠাৎ করে কিছুক্ষণের জন্য হতবিহ্বল হয়ে পড়া, বমি বমি বোধ বা বমি করা। পায়ে দুর্বলবোধ করা।

উপসর্গ:
স্ট্রোকের মারাত্মক উপসর্গ হচ্ছে অজ্ঞান হওয়া, খিঁচুনি, তীব্র মাথাব্যথা ও বমি।

চিকিৎসা:
স্ট্রোক হয়ে গেলে চিকিৎসা অত্যন্ত জটিল। রোগীর উপসর্গ অনুযায়ী চিকিৎসা করা হয়। যদি খেতে না পারেন, তবে নাকে নল দিয়ে খাবার ব্যবস্থা করা হয়। প্রস্রাব ও পায়খানা যাতে নিয়মিত হয়, সে ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রয়োজনে প্রস্রাবের রাস্তায় ক্যাথেটার দিতে হবে। চোখ, মুখ ও ত্বকের যতœ নিতে হবে। বেডসোর প্রতিরোধ করার জন্য নিয়মিত পাশ ফেরাতে হবে। উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। পাশাপাশি অনেক স্ট্রোক রোগীর হার্টের রোগ থাকে। এসব ক্ষেত্রে কার্ডিওলজিস্টের পরামর্শের প্রয়োজন হয়। অন্যান্য চিকিৎসা স্ট্রোকের ধরন অনুযায়ী করা হয়। যেমনÑ ইশকেমিক স্ট্রোকের বেলায় অ্যাসপিরিন, ক্লোপিডগ্রিল জাতীয় ওষুধ দেওয়া হয়। রক্তক্ষরণের কারণে স্ট্রোক হলে অপারেশনের প্রয়োজন পড়ে।

সব হাসপাতালেই থাকা উচিত একটি স্ট্রোক কেয়ার ইউনিট, যেখানে ডাক্তার, নার্স, থেরাপিস্ট এবং অন্যান্য বিশেষজ্ঞ সমম্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে স্ট্রোক রোগীর চিকিৎসা দেবেন। একজন স্ট্রোক রোগীর প্রয়োজন হয় নিউরোলজিস্ট এবং নিউরো সার্জনের। অনেক স্ট্রোক রোগীর অপারেশন অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।

অনেক রোগীর শ্বাসকষ্ট, বেডসোর ইত্যাদি সমস্যা দেখা দেয়। তার রেসপিরেটরি মেডিসিন স্পেশালিস্ট, প্লাস্টিক সার্জনসহ সবার সহযোগিতার প্রয়োজন হতে পারে। রোগীর অঙ্গ সঞ্চালন করে জড়তা কাটিয়ে তুলতে রিহ্যাবিলিটেশন বা পুনর্বাসনের জন্য ফিজিওথেরাপিস্ট প্রয়োজন হয়। রোগী কথা বলতে না পারলে প্রয়োজন স্পিচ থেরাপিস্টের। স্ট্রোক কেয়ার ইউনিট, সমন্বিত স্ট্রোক কেয়ার টিমের ব্যবস্থাপনায় চিকিৎসায় আসবে সুফল, রোগী ও রোগীর স্বজন হবে চিন্তামুক্ত, রোগী লাভ করবে আরোগ্য।

প্রতিরোধ সম্ভব:
স্ট্রোক মস্তিষ্কের কঠিন রোগ এবং তা প্রতিরোধযোগ্য। ব্রেইনের কোষগুলো একবার নষ্ট হলে পুনরায় পুরোপুরিভাবে কার্যকরী হয় না অথবা জন্মায় না। চিকিৎসার চেয়ে এ রোগ প্রতিরোধ উত্তম। স্ট্রোক হলে অনেক সময় রোগী পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়তে পারে। এ জন্য সুনির্দিষ্ট ও জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন। গ্রামাঞ্চলে কিংবা শহরে যে কোনো হাসপাতালে এ রোগের চিকিৎসা সম্ভব। নিয়মিত ওষুধ সেবনের মাধ্যমে উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। ধূমপান, মদ্যপান, মাদক দ্রব্য, তামাক পাতা ও জর্দা খাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। হৃৎপি-ের রোগের চিকিৎসা, রক্তের চর্বি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। চর্বি ও শর্করাযুক্ত খাবার নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। ফাস্টফুড, বাদাম, সন্দেশ-রসগোল্লা, দুধ-ঘি-পোলাও, বিরিয়ানি, পাঙ্গাশ-চিংড়ি-কাঁকড়া, গরু বা খাসির মাংস, নারকেল বা নারকেলযুক্ত খাবার ইত্যাদি কম খাওয়া উচিত। শাকসবজি, অল্প ভাত, পাঙ্গাশ-চিংড়ি-কাঁকড়া বাদে যে কোনো মাছ, বাচ্চা মুরগি ও ডিম খেলে কোনো ক্ষতি হয় না। নিয়মিত ব্যায়াম করতে হবে। বাড়তি ওজন কমাতে হবে।

লেখক:    ডা. এবিএম আবদুল্লাহ
           অধ্যাপক, মেডিসিন বিভাগ
             ডিন, মেডিসিন অনুষদ
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

জীবনের গল্প : গরীব ঘরের এক শিক্ষার্থী

পবিত্র রমজান মাসে পবিত্র ঈদ-উল ফিতর উপলক্ষে কলেজ বন্ধ দেওয়ায় ছেলে বাড়িতে আসে। বাড়িতে আসার পর ছেলে বাবাকে বলে যে, আব্বা আমার টাকা লাগবে, কত টাকা? ৫০০০ হাজার টাকা। কি করবি এত টাকা দিয়ে? ঈদের শপিং করবো। আব্বা আমার কথা শুনে আর কিছু না বলে,আমার হাতে ৫০০০টাকা তুলে দিলো। টাকা গুলি পেয়ে তো আমার আনন্দের সিমা নেই। এবার মন খুলে শপিং করতে পারবো। খুশিতে লুঙ্গি ড্যান্স দিলাম। তারপর টাকা গুলো লুকিয়ে রেখে চলে আসলাম বন্ধুদের আড্ডাতে। সবাইকে তো বলতে হবে,এবার এর ঈদের বাজেট টা। সবার থেকে এবার আমার ঈদের বাজেট বেশি, বন্ধুরাও সবাই বাহবা দিলো। সন্ধার আগে বাসায় ফিরলাম,ইফতার করে নামাজ পড়ে আর বাইরে বার হলাম না। শুয়ে শুয়ে ফেসবুকিং করছিলাম। এমন সময় পাশের রুমে থেকে বাবা মা এর চাপা কন্ঠ ভেসে আসলো কানে। <ওগো শুনছো? <হ্যা বলো। তুমি আকাশকে সব টাকা দিয়ে দিলে তো তুমি কি শপিং করবা আর ঈদের বাজার ও তো করতে হবে,কিছুই তো করা হয় নি। ৫০০০ টাকাই ছিলো। ছেলের কথাই সেটাও বার করে দিলে। <চিন্তা করো না,কারো কাছ থেকে ধার করে নিবো টাকা,আর আকাশ তো এখন কলেজে উঠেছে বড় লোক ছেলেদের সাথে তাকে মিশতে হয়। তাদের মতন না হল...

ম্যানথলের উপকারিতা.......... - ডা. আলমগীর মতি MxN মডার্ণ হারবাল গ্রুপ

ম্যানথলের উপকারিতা..........                             - ডা. আলমগীর মতি                            MxN মডার্ণ হারবাল গ্রুপ। মুখের যত্নে ম্যানথল: ম্যানথলে ব্যাকটেরিয়ানাশক ও প্রদাহনাশক বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা মুখের যত্নে অতি কার্যকর ভূমিকা পালন করে থাকে। ম্যানথল ব্যাকটেরিয়া মেরে ফেলে দাঁতের ক্ষয়, নিঃশ্বাসে দুর্গন্ধ প্রতিরোধ করে এবং দাঁত ও জিহ্বা পরিষ্কার রাখে। ইদানীং ম্যানথল টুথপেস্ট, মাউথওয়াশ ও দন্তরোগের চিকিৎসাসহ বিভিন্ন পণ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রতিদিন কিছু পুদিনাপাতা খেলে দন্ত সুস্থ রাখতে কার্যকর ভূমিকা পালন করে। ব্যথা প্রতিরোধ করে: যে কোনো ব্যথায় পুদিনার নির্যাস ব্যবহার করা হয়। কারণ শরীরের যে কোনো জায়গায় ব্যথা অনুভূত হলে ম্যানথল সে জায়গায় শীতল অনুভূতি দেয় এবং ব্যথা কমাতে সাহায্য করে। ম্যানথল মাংসপেশি শীতল রাখে এবং শরীরে প্রশান্তি অনুভূত হয়। গর্ভবতীকে সুস্থ রাখে: গর্ভবতী নারীদের জন্য ম্যানথল খুব উপকারী। গর্ভবতী নারীদের যখন বমি বমি ভাব...

সকালের খাবারটা হোক পরিমাণমতো

সকালের খাবারটা হোক পরিমাণমতো......... - ডা. আলমগীর মতি MxN মডার্ণ হারবাল গ্রুপ। www.modernherbalbd.com খাবার-দাবারের মধ্যে সকালের নাস্তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। গবেষকরা তাই বলেন। সম্প্রতি টাইমস অব ইন্ডিয়ার এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমন কথাই। আমরা ভাবি, সকালে কম খাওয়া ভালো এবং সে খাবারতালিকায় যেনতেন খাবার হলেই হলো। কিন্তু সকালে কম খেয়ে সারাদিন যা খুশি তাই খেলে শরীরের ওজন বেড়ে যেতে পারে। দীর্ঘসময় না খেয়ে থাকার পর যা খুশি তাই খেলে ওজন তো কমবেই না, বরং অন্য রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। গবেষকদের পরামর্শ হলো, সকালে পরিমাণমতো নাস্তা খাওয়াই ভালো। এ নাস্তার মধ্যে থাকতে পারে এক কাপ চা বা কফি, যা পান করলে নিজের মেজাজ ভালো থাকবে। তবে একাধিক কাপ চা বা কফি পানের অভ্যাস মোটেও ভালো নয়। তাতে ঘুমের সমস্যা হতে পারে। শরীরে পড়তে পারে তার খারাপ প্রভাব। সকালে উচ্চ ক্যালোরিযুক্ত খাবার না খেয়ে শসা, ফল, বাদাম জাতীয় খাবার খেলে শরীর ভালো থাকে। শত তাড়ার মধ্যে সকালে ডিম ভাজা দিয়ে খাবার সেরে ঘর থেকে বের হলেও মন্দ হয় না। বরং ...